মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

কোটচাঁদপুর উপজেলার পটভূমি

কোটচাঁদপুর একটি পুরাতন উপজেলা যা ১৭৭২ সালে থানা হিসাবে গঠিত হয় । এর নামের উৎপত্তি  সম্পর্কে নির্দিষ্ট কিছুই জানা যায়নি। প্রচলিত আছে অতীতে চাঁদ খান নামে এক ধার্মিক ব্যক্তি ইসলাম প্রচারের জন্যে এখানে বসতি স্থাপন করেন।  ধার্মিক ব্যক্তির বাড়ি চারপাশে শহরের মত গড়ে ওঠে। সম্রাট জাহাঙ্গীর এর আমলে বিদ্রোহী বারো ভুঁইয়া থেকে রক্ষা কারার জন্য একটি দেয়াল নির্মাণ করা হয়েছিল। ফার্সি ভাষায় দেয়ালকে কোট বলা হয়। ধারণা করা হয় কোটচাঁদপুর নামের উৎপত্তি কোট এবং চাঁদ খান এই দুইটি শব্দ থেকে।

 

কোটচাঁদপুর উপজেলার আয়তন ১৬৫.৬৩ কিমি। ইহা ২৩°২২' থেকে ২৩°৩৩'  উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮৮°৫৫' থেকে ৮৯°০৬' পূর্ব দ্রাঘিমাংশ এর মাঝে অবস্থিত।  এর উত্তরে ঝিনাইদহ সদর উপজেলা, পূর্বে কালিগঞ্জ উপজেলা, দক্ষিণে মহেশপুর উপজেলা এবং পশ্চিমে চুয়াডাঙ্গা জেলার জীবননগর উপজেলা এবং ঝিনাইদহ সদর উপজেলা।

 

একদা কোটচাঁদপুর কোন গ্রাম বা লোক বসতি ছিল না । এই স্থানটি নদী গর্ভে ছিল। চর্তুদিকে খাল-বিল- বাওড় ইত্যাদি জলাশয় দ্বারা বেষ্টিত ছিল। এতে প্রতীয়মান হয় যে, এই স্থানটি কয়েকটি নদীর সঙ্গম ছিল।প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর পূর্বে যশোর তথা কোটচাঁদপুর সমুদ্র গর্ভে নিমগ্ন ছিল।ভৌগলিক দিক পর্যালোচনা করলে দেখতে পায় বংলাদেশ পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ। আর ব-দ্বীপের কাজ হল জলকে স্থল করা এবং স্থলকে উর্বর করা। প্রথমে নদীর স্রোত সাগরে পতিত  হয়। নদীর স্রোত পলি মাটি বহন করে সমুদ্রের তীরে ভূমি গঠন করে।  বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণে সুবিশাল জলরাশি বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী কোটচাঁদপুর এর অবস্থান ছিল।খৃষ্টীয় পঞ্চম শতাব্দীতে গঙ্গার বির্স্তীর্ণ জলরাশির মধ্য হতে দ্বীপের উৎপত্তি হয়েছিল।কালের ক্রমধারায় হিমালয়ের তুষার নিঃসৃত জলরাশি গঙ্গা নদীতে পতিত হওয়ায় মাধ্যমে পর্বতরেণু পদ্মা দিয়ে দক্ষিণে সুবিশালজলরাশি বঙ্গোপসাগরে যেয়ে মিশে যায়। এইভাবে  যুগযুগ ধরে পর্বতরেণু প্রবাহিত হওয়ার দরুণ চরভূমি সৃষ্টি হয় ও সাগর দক্ষিণে সরে যেতে থাকে। চরভূমি সৃষ্টির প্রারম্ভে বন-জঙ্গলে ভরে উঠে । জঙ্গলময় স্থানটি বর্তমান কোটচাঁদপুর। আদি যুগে কোটচাঁদপুর এলাকাটি বক- দ্বীপের অন্তর্গত ছিল।আনুমানিক তিন- সাড়ে তিন হাজার বছর পূর্বে ঋকবেদ আমলে এদেশের ’’দী’’ বা- দ্বীপ অন্ত্য জায়গাগুলো ছিল জলাভূমি। বনাঞ্চল ছিল বিশালকায়। বসতি ছিল না বলেই চলে। নবীন চন্দ্র দাস তাঁর এশিয়ার প্রাচীন ভূ-গোল ‘‘Ancient Geogrophy of Asia” গ্রন্থে অতি প্রাচীনকালে গাঙ্গেয় ব-দ্বীপের দক্ষিনাঞ্চল অতল সমুদ্রের একাংশ বলে উল্লেখ করেছেন । পলিমাটি দ্বারা গঠিত গাঙ্গেয় ব-দ্বীপে ধীরে ধীরে বনভূমিতে পরিণত হয় এবং মানুষ বসতি স্থাপন করতে শুরু করে। এই ভাবে যুগযুগ ধরে ঘরবাড়ি, বাগিচা ঘনবসতিপূর্ণ ও কোলাহলময় নগর সৃষ্টি হয়। অতীতে তমসাকৃত ও জঙ্গলাকীর্ণ কেয়া বনে আচ্ছন্ন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে ভরপুর ও মনোমুগ্ধকর বসবাসের উপযোগী গাঙ্গেয় ব-দ্বীপের অন্তর্গত কোটচাঁদপুর অঞ্চলে প্রথমে মানুষের বসতি গড়ে উঠে। কেননা গাঙ্গেয় ব-দ্বীপ বঙ্গদেশের একাংশ বলে প্রাচীন গ্রন্থে উপবঙ্গ বলে খ্যাত। বৃহৎসংহিতায় উপবঙ্গ বলতে যশোর ও তার আশপাশের জঙ্গলময় কয়েকটি অঞ্চলকে বুঝানো হয়েছে। স্বাভাবিকভাবে অনুমেয় যে, নদীর সঙ্গমে জঙ্গলাকীর্ণ কেয়াবনই বর্তমান কোটচাঁদপুর। যা উপবঙ্গের অন্তর্গত ছিল। এই উপবঙ্গ একটি বৃহৎদ্বীপ। এক সময় উহা অনেকগুলি দ্বীপের সমষ্টি ছিল। সমস্ত দ্বীপই গঙ্গার পলিমাটি হতে উৎপন্ন হয়। ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ-বিন-বখতিয়ার খিলজী বাংলা আক্রমনের প্রাক্কালে নবদ্বীপ ছিল দ্বিতীয় রাজধানী। অনেকেরই ধারণা নবদ্বীপ হতে নদীয়া নামের উৎপত্তি। নবদ্বীপ কয়েকটি দ্বীপের সমষ্টি। নবদ্বীপ বলতে সাধারণত নয়টি দ্বীপের সমষ্টিকে বোঝায়। কোন কোন ক্ষেত্রে সবদ্বীপকে বারটি দ্বীপের সমষ্টি হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়। নবদ্বীপ যে সমস্ত দ্বীপের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে তার মধ্যে কোটচাঁদপুর সূর্যদ্বীপের অন্তর্গত। এ দ্বীপের প্রাচীন নাম ছিল যোগীন্দ্র দ্বীপ। এ দ্বীপ সম্পর্কে মুল্যবান তথ্য পাওয়া যায়। সে তথ্যটি হলঃ সেন বংশীয় রাজা বল্লাল সেন নীচ জাতীয় নারীর চেহারায় মুগ্ধ হয়ে তাকে পত্নী রূপে গ্রহন করেন। এ কারণে লক্ষন সেন প্রতিবাদ করলে উক্ত নারীর কুমন্ত্রণায় বল্লাল সেন পুত্রকে নির্বাসিত করেন। এর কিছু দিন পর বল্লাল সেন বর্ষাকালে ভোজনের উদ্দেশ্যে অন্দর মহলে প্রবেশ করে ভোজন গৃহের প্রাচীন একটি  শ্লোক দেখে লক্ষণ সেনের কথা মনে করে অনুতপ্ত হলেন। তিনি রাজ নাবিক গণকে ডেকে ঘোষনা করলেন পরের দিন সূর্যোদয়ের পূর্বে তার পুত্রকে কেউ এনে দিতে পারলে তাকে স্বীয় রাজ্যের একাংশ পুরস্কার দেওয়া হবে। সূর্য্য নামক দুঃসাহসিক রাজ নাবিকগণ এ কাজে সম্মত হন। তিনি দ্রত গামী ডিঙ্গি নৌকা নিয়ে যাত্রা করলেন এবং যথাসময়ে কার্য সম্পাদন করেন।  এতে বল্লাল সেন মুগ্ধ হয়ে কৃতিত্বের পুরষ্কার স্বরুপ তাকে যোগীন্দ্র দ্বীপের যে অংশ দান করেছিলেন সেটাই সূর্য দ্বীপ। এ অঞ্চল সূর্যদ্বীপ নামে পরিচিত। এই দ্বীপে মৎস্যজীবীদের আবাসস্থল ছিল। মৎস্যজীবিরাই জনবিচ্ছিন্নভাবে বাস করত। আর মৎস্যজীবিদের শাসনকর্তাকে সূর্যরাজা বলা হত। কোটচাঁদপুর এলাকা সুন্দর বনের বর্ধিতাংশ বলে গন্য হত। সুন্দর বনের কেওড়াফল নদীর পানিতে এসে চর অঞ্চলে ভাটার সময় জমা পড়ে থাকত। সুন্দরবনের কেওড়া ফল নদীর পানিতে এসে চর অঞ্চলে ভাটার সময় জমা পড়ে থাকত। ক্রমান্বয়ে কেওড়া গাছ পরিপূর্ণতা লাভ করে জঙ্গলে পরিপূর্ণ হয়। এ গাছ খুব বড় হয়। চরের উপরে প্রায়ই একস্থানে বহুসংখ্যক গাছ সারিবদ্ধ হয়ে নদীর বাঁকে সবুজ শ্যামল শোভা বিস্তার করে। পাতাগুলি জিওলের পাতার সরু। কেওড়া ফল সুস্বাদু। উহা মানুষ আহার রূপে ব্যবহার করত। মৎস্যজীবিরা বছরে ৩/৪ মাসের জন্য মৎস্য শিকার করতে আসত। মৎস্য শিকারের সময় মৎস্যজীবীরা কেওয়া বনে কুড়ে ঘর তুলে বসবাস করতে শুরু করে। পর্যায়ক্রমে এখানে জনপদ গড়ে ওঠে। এই জনপদ সমৃদ্ধ স্থানটি কেওয়াপোল নামে পরিচিতি লাভ করে।

 

এই জনপদটি একদিন তমসাকৃত ও জলাকীর্ণ কেয়াবনে আচ্ছন্ন প্রাকৃতিক দৃশ্য ছিল অত্যন্ত মনোরম। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এ অঞ্চলটি বিদেশীদের কাছে লক্ষ্যবস্ত্ততে পরিণত হয়। মৎস্যজীবীদের নিবাসস্থল কেওয়াপোল ধীরে ধীরে গ্রামের সূত্রপাত ঘটায়। ক্রমে ক্রমে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটে যা বিদেশীদের কাছে আকর্ষণীয় স্থান হিসাবে পরিণত হয়। ৭১২ খৃষ্টাব্দে মুহাম্মদ-বিন-কাশিম এর সিন্ধু বিজয়ের ফলে এ অঞ্চলে মুসলিম শাসনের সুত্রপাত ঘটায়। এ সময়ে ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম শাসন সম্পূর্ণরূপে সফলতা লাভ করতে পারেনি। ১২০৪ খৃষ্টাব্দে ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ-বিন-বখতিয়ার খলজীলক্ষণ সেনের রাজত্বকালে নদীয়া আক্রমণ করে। এ সময়ে রাজা লক্ষণ সেন বৃদ্ধ বয়সে দুই পুত্র কেশব সেন ও বিশ্বরূপ সেনের নিকট পূর্ববঙ্গে শাসনকার্যের দায়িত্ব অর্পন করে নবদ্বীপে গঙ্গাবাস করছিলেন। তিনি কোন প্রতিরোধ ব্যবস্থা না নৌকাযোগে পূর্ববঙ্গে পলায়ন করে। বিনা যুদ্ধেবখতিয়ার খলজী নদীয়া জয় করেন। তবে নদীয়া জয়ের সঙ্গে সঙ্গে সমগ্র বাংলা তথা কোটচাঁদপুর মুসলমানদের শাসনাধীনে আসেনি। এরপরও দুই বছর পূর্বে বঙ্গে সেন শাসন বলবৎ থাকলেও লক্ষণ সেনের পরাজয়ের মাধ্যমে বাংলায় সেন শাসনের অবসান ঘটে বলে প্রতীয়মান হয়।

 

বখতিয়ার খলজী শেষ জীবনেপূর্ববঙ্গ এবং দক্ষিণ ও পশ্চিম বঙ্গ রাজ্যভূক্ত না করে ১২০৬ খ্রীষ্টাব্দে দেবকোটে রোগাক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর মুখে পতিত হয়। এরপর তাঁর সহযোদ্ধা মোহাম্মদ শীরন খলজী বখতিয়ারের নীতি অনুসরন করে থাকে। ১২০৮ খ্রীষ্টাব্দে হুসামউদ্দীন ইওয়াজ খলজী দেবকোটের শাসনভার গ্রহণের ২ বছর অব্যহতির পর ১২১০ খ্রীষ্টাব্দে আলা-উদ-দীন খলজী বাংলাদেশের প্রথম স্বাধীন সুলতান হিসাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ১২১২ খ্রীষ্টাব্দে হতে ১২৮৭ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত দিল্লীর সুলতান গিয়াস-উদ্-দীন বলবানের মৃত্যু পর্যন্ত বাংলা দিল্লীর শাসনাধীনে ছিল। এ সময় বাংলার ১৫ জন শাসনকর্তার মধ্যে দশজন শাসক দাসরূপে জীবন আরম্ভ করলেও স্বীয় প্রতিভাবলে উচ্চপদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। সুলতান শামস-উদ-দীন ফীরুজ শাহের শাসনামল হতে দিল্লীর সুলতান মোহাম্মদ বিন তুঘলকের মধ্যে বাংলা স্বাধীন হয়ে যায়। ১৫৩৮ খ্রীষ্টাব্দে ফখরুদ্দীন মোবারক শাহের মাধ্যমে বাংলার স্বাধীন সুলতানী আমলের সূত্রপাত ঘটে এবং পরবর্তী ১৭৩৮ পর্যন্ত বলবৎ থাকে। সুলতানী আমলে ২০০ বছরের মধ্যে বিভিন্ন বংশের শাসকগণ বাংলা শাসন করেন। এগুলো হলঃ ইলিয়াস শাহী বংশের শাসন, হাবশী শাসন, হুসেন শাহী বংশের শাসন। শুধুমাত্র হাবশী শাসন (১৪৮৭-১৪৯৩ খৃঃ) ব্যতীত অন্যান্য শাসনামলে কোটচাঁদপুর তাদের রাজত্বের অন্তর্গত ছিল। বঙ্গদেশ মুসলমান কর্তৃক বিজিত হলে অনেক মুসলমান তুর্কী, আফগানিস্তান, তাঁতার, ইরান প্রভৃতি স্থানে এসে বসবাস শুরু করে। এ সময় থেকে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে সুফী-দরবেশ গণ ইসলাম প্রচার শুরু করে। সেকালে কোন পেশাদার ধর্ম প্রচারক ছিলেন তার প্রমাণ পাওয়া যায় না। তবে অসংখ্য সুফী-দরবেশগণই বাংলার সর্বত্র ইসলাম প্রচার করেন। তেমনি তুর্কী আফগানিস্তানের মানপুর হতে চাঁদ খাঁ নামক একজন দরবেশ কিছু সহচর নিয়ে এ জনপদে আসেন। তুর্কী শাসনামলে রাজশক্তির সাহায্য ও সহানুভূতি লাভ করে এদেশে ইসলাম সম্প্রসারনে নিয়োজিত ছিলেন। তাঁদের ধর্ম প্রীতি ও ধর্ম বিস্তারের সহানুভূতির কারণে এ অঞ্চলে আরব, পারস্য আফগানিস্তান তথা মধ্য এশিয়া থেকে পাক-ভারত ও অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে পড়েন। এইভাবে বহু বিদেশী মুসলিম এদেশে ক্রমে স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে যান এবং তারাও এ দেশীয় হিন্দু, বৌদ্ধ, অনার্য ও পার্বত্য উপজাতিদের মধ্যে ইসলাম প্রচারের চেষ্টা করেন। সারা বাংলাদেশের শহর, বন্দর, গ্রাম গঞ্জে সর্বত্র সুফী দরবেশগণ ইসলাম প্রচারের চেষ্টা করেন। বাংলাদেশের অন্যান্য জেলার মত বৃহত্তর যশোর জেলায় ইসলাম ধর্ম ও ইসলাম প্রচারিত হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে যার নাম সর্বাগ্রে তিনি হলেন হযরত খান জাহান আলী। এরই সঙ্গে তাঁর শিষ্যগণের মধ্যে গরীব শাহ, ইহরাম শাহ, বুড়া খান ও তৎপুত্র ফতেহ খাঁন, পীর মুহিউদ্দীন, পীর জয়ন্তী, পীর সুজান শাহ প্রভৃতি খুলনা ও যশোর জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে ইসলাম প্রচার তা প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। তাঁর শিষ্যরা ইসলাম প্রচারে বারোবাজার নামক স্থানে নিয়োজিত ছিলেন। অতীতে বারোবাজার ইসলাম প্রচারের কেন্দ্র ছিল। বারোবাজার নামকরণের ক্ষেত্রে দেখা যায়, বারোজন সুফী দরবেশ বা আউলিয়াগণ ইসলাম প্রচারে নিয়োজিত ছিলেন। এ স্থানে ইসলাম প্রচারে তাঁরা নিয়োজিত ছিলেন তা বর্তমান পূরাকীর্তি থেকে অনুমান করা যায়। যতদূর জানা যায়, তাঁর শিষ্যরা কেউই কোটচাঁদপুরে ইসলাম প্রচারের জন্য আসেনি। কিন্তু কোটচাঁদপুরের সীমানা সম্পর্কে অজ্ঞাত থাকায় হযরত খান জাহান কিংবা শিষ্যরা কোটচাঁদপুর সীমান্ত এলাকায় এসেছিলেন কিনা তা সঠিকভাবে বলা দুরুহ। প্রবাদ মতে, ১৪১৫ খৃঃ হযরত খান জাহান আলী (রহঃ) গোপনে জোনপুরের শাসনকর্তা ইব্রাহিম শর্কীকে বাংলার হিন্দু মুসলমানদের সমস্যা অবহিত করলে তিনি ৬০,০০০ (ষাট হাজার) সুশিক্ষিত সৈন্যদলসহ বাংলায় প্রেরণ করেন। অনেকদিন পর বহু আউলিয়া দরবেশ ও সৈন্যদল নিয়ে গঙ্গাপার হয়ে নদীয়ার মধ্য দিয়ে বর্তমান চুয়াডাঙ্গা জেলার দৌলতগঞ্জে (জীবননগর) প্রবেশ করেন। সেখান হতে ভৈরব (কথিত কপোতাক্ষ) নদ দিয়ে ঝিনাইদহ জেলার কোটচাঁদপুর হয়ে হাকিমপুর গ্রামের প্রায় ২ কিলোমিটার পূর্বে যাত্রাপুর ও বড় ধোপাধী গ্রামে আসেন। এর পর তিনি বারবাজার নামক স্থানে আস্তানা গড়ে তোলেন। ১৪১৮ খৃঃ বাংলার দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে ইসলাম প্রচার ও প্রসারের লক্ষ্যে তাঁর অন্যতম দুইজন সাগরেদ চাঁদখান ও বাহাদুর খা কে নিয়ে ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ধারন নিয়ে বারবাজার নামক স্থানে বৈঠকে বসেন। হযরত খানজাহান আলী (রহঃ)-র সাগরেদ চাঁদ খান কোটচাঁদপুর এ ইসলাম প্রচার কিংবা আস্তানা গড়ে তোলেননি। এছাড়া সতীশ চন্দ্র মিত্র মোঘল আমলে প্রারম্ভে জনৈক হিন্দুু মুসলমান হয়ে চাঁদ খান উপাধি ধারণ করে বলে উল্লেখ করেছেন। উক্ত চাঁদ খাঁ সাতক্ষীরার অন্তর্গত চাঁদপুরে বাস করেন। অপরদিকে কোটচাঁদপুর এ চাঁদ খাঁ সম্পর্কে সম্পর্কে কবি শামসুদ্দীন আহমদ উল্লেখ করেছেন যে, তুর্কী আফগানিস্তান থেকে আগত চাঁদ খাঁ মুঘল সম্রাট মহামতি আকবরের রাজত্বকালে তমসাকৃত ও জঙ্গলাকীর্ণ কেয়াবনে আচ্ছন্ন জঙ্গল পরিষ্কার করে বসতি স্থাপন করেন। আফগানিস্তানের মানপুর থেকে আগত চাঁদ খাঁ বসবাসের মাধ্যমে এ অঞ্চলে শ্রীবৃদ্ধি সাধন করে থাকে। উক্ত চাঁদ খাঁ এ অঞ্চলে ইসলাম প্রচার করেন। এমন নিদর্শন বা সন্ধান পাওয়া যায় না। তাছাড়া তাঁর কোন সাগরেদ ছিল বলে জানা যায় না। উল্লেখ্য যে, তিনজন চাঁদ খাঁ সম্পর্কে জানতে পারি তা ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তি। এ অঞ্চলে আহত তিনজনই ভিন্ন সময়ে এসেছেন এবং বিভিন্ন জায়গায় বসতি স্থাপন করেন। কোটচাঁদপুর চাঁদ খাঁ সপরিবারে এসে তমসাকৃত ও অন্ধকারাচ্ছন্ন কেওয়াপোলের মধ্যে বসতি স্থাপন করেন। তিনি ক্রমান্বয়ে এ জনপদের সমৃদ্ধি আনয়ন করে। ফলশ্রুতিতে কেওয়াপোল চাঁদপুর নামে পরিচিতি লাভ করে। ১৫২৬ খৃষ্টাব্দে পানিপথের প্রথম যুদ্ধের মাধ্যমে সম্রাট বাবর ভারতীয় উপমহাদেশে মুঘল শাসনের সূত্রপাত ঘটালেও ষোড়শ শতকের শেষ পর্যন্ত বাংলায় মুঘল শাসনভূক্ত হয়নি। বাংলায় মুঘল শাসনভূক্ত হওয়ার পূর্বে এ অঞ্চল কররানী বংশের শাসন বিদ্যমান ছিল। কররানী হল আফগান জাতির একটি গোত্রের নাম। এ গোত্রের তাজখান কররানী ১৫৬৪ খৃষ্টাব্দে শুর বংশীয় সুলতান তৃতীয় গিয়াসউদ্দীনকে হত্যা করে বাংলায় আফগান কররানী বংশের সূচনা হয়। উল্লেখ্য যে, আফগান শাসনামলে কোটচাঁদপুর তাঁদের শাসনাধীনে ছিল। আফগান কররানী বংশের শাসকরা হলেন সুলায়মান কররানীর রাজত্বকালে বাংলার স্বাধীন অঞ্চলগুলো তাঁর রাজ্যভূক্ত হয়। কোটচাঁদপুরও কররানী বংশীয় শাসন প্রতিষ্ঠিত ছিল। বর্তমান চৌগাছা উপজেলার স্বরূপপুর গ্রামটি কোটচাঁদপুর সীমানার অন্তর্গত ছিল। স্বরূপপুর গ্রামের মসজিদে প্রাপ্ত দাউদ শাহ কররানীর (১৫৭২-৭ খৃঃ) শিলালিপির ভিত্তিতে প্রতীয়মান হয় যে, এ সময় কোটচাঁদপুর কররানী বংশীয় রাজত্ব বিদ্যমান ছিল। দাউদ খান কররানী যামানিয়া দূর্গ করলে মোঘল সম্রাট আকবর ১৫৭৬ খৃষ্টাব্দে সামরিক অভিযান পরিচালনা করে তাকে পরাজিত ও হত্যা করেন। এর মধ্য দিয়ে বাংলায় আফগান শাসনের অবসান ঘটে। এ সময়ে বাংলায় বহু জমিদার ও ভূ-স্বামী প্রবল প্রতাপান্বিত হয়ে ওঠে। তিনশত বৎসর পাক-ভারতে তুর্কী-আফগান শাসনের পতনের পর পাঠান ও তুর্কী বিদ্রোহী মনোভাব ধুমায়িত হতে থাকে। এ বিদ্রোহী পাঠানদের সঙ্গে দেশীয় হিন্দু ও মুসলিম রাজারাও যোগদান করেন। প্রাথমিক পর্যায়ে মুঘলদের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো খুবই কষ্ট ছিল। এরই পরিপ্রেক্ষিতে দেখা যায় দিল্লীর সম্রাট আকবর বাংলায় মুঘল শাসনের সূত্রপাত ঘটালেও সমগ্র বাংলায় অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। পূর্ববঙ্গ এবং পশ্চিম ও উত্তর বাংলার বেশকিছু অঞ্চল বড় বড় জমিদারদের অধিকারে ছিল। অধিকাংশ জমিদারই আকবর তথা মুঘলদের কর্তৃত্ব মেনে নেয়নি। তারা নিজ নিজ জমিদারীতে স্বাধীন ছিল। এ সকল বড় বড় জমিদারদের যুদ্ধ বিগ্রহ বা আন্দোলন সবই সম্রাট আকবর ও জাহাঙ্গীরের রাজত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। মুঘল শাসনের প্রারম্ভে স্বাধীন জমিদাররা বার ভূইয়া নামে পরিচিত। বার ভূইয়াদের মধ্যে যশোরের রাজা প্রাতাপাদিত্য ছিলেন অন্যতম। সম্ভবত ১৫৮৭ খৃষ্টাব্দে রাজা প্রতাপাদিত্য যশোর রাজ্যের রাজা হন। তিনি যশোর বা ঈশ্বরীপুরের সংলগ্ন ধুমঘাটে রাজধানী স্থাপন করেন। মুঘল শাসনের বিরুদ্ধে যশোর অঞ্চলকে মুক্তি রাখার জন্য নৌ-বাহিনী ও সেনাবাহিনী গড়ে তোলেন। তাঁর সৈন্যসংখ্যা ছিল ২০,০০০। এ সকল সৈন্য বিভাগে পাঠান, পর্তুগীজ ও হিন্দু সেনাপতি নিয়োগ করেন। এ অঞ্চল নদীবেষ্টিত হওয়ায় শক্তিশালী নৌ-বহর ছিল। তাছাড়া রাজ্যের নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনা করে রাজ্যের কেন্দ্রস্থল ও সীমান্তবর্তী কয়েকটি দুর্গ নির্মাণ করেন। দুর্গ হল প্রাচীর বা দেওয়াল ঘেরা সেনানিবাস। সতীশ চন্দ্র ১৪ টি দুর্গের উল্লেখ করেছেন। এ দুর্গগুলো মাটির তৈরী ছিল। তাঁর নৌ-সেনা বা সৈন্যবাহিনী দুর্গে অবস্থান করত। প্রতিটি দুর্গে কামান থাকত। দুর্গের চারিপাশে নদীর মত প্রশস্ত জলধারা ছিল। অপরদিকে মুঘল সম্রাট আকবরের ১৬০৫ খৃষ্টাব্দে মৃত্যু হলে দিল্লীর সম্রাট হন জাহাঙ্গীর। বাংলা মুঘল সাম্রাজ্যের সুবায় পরিণত হয়। ১৬০৮ খৃষ্টাব্দে সম্রাট জাহাঙ্গীর ইসলাম খানকে সুবাদার হিসাবে বাংলায় পাঠান। এ সময় রাজমহল সুবে বাংলার রাজধানী ছিল। শাসন কার্যের সুবিধার জন্যে ইসলাম খান সুবাদার হিসাবে নিয়োগ লাভের পর বার ভূইয়াদের মধ্যস্থল মনে করে ঢাকায় রাজধানী স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। রাজমহল হতে ঢাকা পৌছাতে ইসলাম খানের দুই বছর সময় লেগে যায়। অর্থ্যাৎ ১৬১০ খৃষ্টাব্দে ঢাকায় পৌছায়ে সুবাদার ইসলাম খান সম্রাট জাহাঙ্গীরের নামানুসারে নামকরণ করেন জাহাঙ্গীর নগর। পথিমধ্যে অনেক জমিদার বশ্যতা স্বীকার করেন। যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্য উপঢোকন সহ মুঘল অভিযানের সাহায্য ও সহযোগিতার আশ্বাস দেন। ইসলাম  খান ভাটিতে বিদ্রোহ দমন কালে কোন সাহায্য না করায় তাঁর আপন ভ্রাতা এনায়েত খাঁকে প্রধান সেনাপতি নিয়োগ করে যশোর রাজ্য আক্রমনের জন্য প্রেরণ করেন। ১৬১১ খৃষ্টাব্দে ধুমঘাটের যুদ্ধে মুঘল বাহিনীর প্রতিরোধ না করতে পেরে প্রতাপাদিত্য আত্মসমর্পন করেন। এনায়েত খাঁ তাকে বন্দী করে ঢাকায় প্রেরণ করেন। সেখানে ইসলাম খানের হেফাজতে থেকে লৌহ পিজ্ঞরে আবদ্ধ হয়ে আগ্রায় প্রেরণ করেন। পথিমধ্যে বারানসীতে মৃত্যুর মুখে পতিত হলে এ অঞ্চল মুঘল সাম্রাজ্যভূক্ত হয়। যশোর রাজ প্রতাপাদিত্যের পতনের পর যশোরে ফোজদারী শাসন প্রবর্তিত হয়। এনায়েত খাঁকে প্রথম ফৌজদার হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এরই সঙ্গে কোটচাঁদপুর ফৌজদার শাসনের নিয়ন্ত্রণে আসে।

 

ক্রমে ক্রমে এ অঞ্চল ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়। ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য পর্তুগীজরাই সর্বপ্রথম আসতে শুরু করেএবং চট্টগ্রাম ও হুগলী ঘাটি গড়ে তুলেছিল। এছাড়াও যশোর অঞ্চলে পর্তুগীজদের বাণিজ্য চলত। পর্তুগীজরা বাণিজ্যের পাশাপাশি জলপথে জলদস্যুতা শুরু করে। এতে সাগর ও নদী তীরবর্তী লোকজন অতিষ্ট হয়ে উঠে। এ জলদস্যুদের হার্মাদ বলা হত। এদের সঙ্গে এসে মগ জলদস্যুরা। এরা বর্তমান মায়ানমারের আরাকান রাজ্যের অধিবাসী। বাংলাদেশ ও মায়ানমার নাফ নদী দ্বারা বিভক্ত। অতীতে নৌ-পথ ছিল যোগাযোগের মাধ্যম। চট্টগ্রামে ইউরোপীয় বণিকদলের সঙ্গে মগদস্যুদের সখ্যতা সহজে গড়ে উঠে। সুবেদার শায়েস্তা খানের শাসনামলে পতুর্গীজও মগ জলদস্যুদের দমন করার জন্য তাঁর উমেদ খাঁকে সেনাপতি হিসাবে দায়িত্ব অর্পণ করেন। উমেদ খাঁ জলদস্যুদের দমন করে বাংলায় শান্তি শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনে। মুঘল সৈন্যবাহিনী কোটচাঁদপুর অতিক্রম করার সময় নদীর তীরে নিরাপত্তার জন্য অবস্থান করেন এবং মুঘল সৈন্যবাহিনী ক্যান্টনমেন্ট বা দুর্গ গড়ে তোলেন। বিশাল জলরাশিময় স্থানে চারিদিকে নদীবেষ্টিত সুরক্ষিত নিরাপত্তার জন্য অবস্থান করে থাকে। জলদস্যু ও অন্যান্য কোন শক্তির আক্রমণের হাত থেকে বাঁচার জন্য প্রতিরক্ষা ব্যুহ গড়ে তোলে। মুঘল শাসনামলে কোটচাঁদপুর এ সেনা দুর্গ ছিল, সে সম্পর্কে সরকারী তথ্য (BANGLADESH  DISTRICT  GAZETTEERS.  JESSORE-1979) মতে,  “Chandpur is the proper name of the place and the prefix Kot is apparently due to the fact that it was a police-station which was practically a military stronghold under the Mughal rule.”  এ বিষয়ে আরো দেখতে পাই,  “During Emperor Jahangir’s reign, the Subedar of Bengal Islam Khan sent a Fouzdar here, and established a fort to product it against the Bhuian revolution. The Fouzdar fortified it with high walls around.” 

 

সুরক্ষিত নিরাপত্তার জন্য শক্তিশালী দুর্গ ছিল তা প্রতীয়মান হয়। মুর্শিদ কুলি খানের শাসনামলে পুর্বাঞ্চলীয় এলাকার রাজস্ব মুর্শিদাবাদে প্রেরণের পথসমুহের মধ্যে চাঁদপুর ছিল অন্যতম নিরাপদ স্থান। কেননা শক্তিশালী সৈন্যবাহিনী দ্বারা দুর্গের নিরাপত্তা ছিল। বৃহত্তর যশোর জেলার প্রাচীনতম পুলিশ স্টেশনগুলোর মধ্যে মাগুরার ইছাখাদা অন্যতম পুলিশ ষ্টেশন। প্রকৃতিগতভাবে এটা ছোট সেনাদুর্গ। ১৮০৪ সালের ৪ নভেম্বর কালেক্টরের চিঠিতে স্থানটির নাম কোট ইছাখাদা বলে উল্লেখ করেন। অনুরূপভাবে দেখা যায়, মুঘল শাসনামলে সেনাদুর্গ বিদ্যমান ছিল। যা নদীর গতিপথে বিভিন্ন দুর্গের কার্য সম্পাদন করেছিল। ১৭৯৩ সালের থানার তালিকাতে কোটচাঁদপুর এর নাম ছিল না। কিন্তু ১৮১৪ সালের তালিকাতে দৃশ্যমান হয় এবং ১৮১৫ খৃষ্টাব্দের কালেক্টরের চিঠিতে উল্লেখ করেন, ‘‘A place called Kotchandpur, at which a thannah is established, in appearance a town of some importance and magnitude.”

 

মুসলিম সুফী সর্দার চাঁদ খাঁ খরস্রোতা কপোতাক্ষ নদের তীরে বসতি স্থাপনের মাধ্যমে কেওয়াপোলের সমৃদ্ধি আনয়ন করে। যেটা পরবর্তীকালে চাঁদপুর নামে সমধিক পরিচিত হয়। একই সাথে মুঘল সৈন্যবাহিনী নিরাপত্তা ব্যুহ গড়ে তোলার জন্য উচু দেয়াল বেষ্টিত স্থাপত্যকৃত দুর্গ তৈরী করেন। ইংরেজ শাসনামলে তা দেখে সৈন্যবাহিনীর দুর্গ মনে করে স্থানটির নামের পূর্বে কোট সংযুক্তির মাধ্যমে কোটচাঁদপুর নামকরণ হয়। সুতরাং বুঝা যায় যে, ১৮১৫ খৃষ্টাব্দে চাঁদপুরের নাম পরিবর্তিত হয়ে কোটচাঁদপুর নামে নবতর জীবন লাভ করে।

 

১৭৫৭ সালে পলাশী যুদ্ধর মাধ্যমে বাংলার স্বাধীনতা সূর্য অস্তমিত হয়ে যায়। সেই সঙ্গে নবাবী শাসনের অবসান ঘটে এবং ইংরেজ শাসনের সূত্রপাত হয়। ১৭৬৫ সালে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী সুবে বাংলার দেওয়ানী লাভের মাধ্যমে কোটচাঁদপুর কোম্পানীর শাসনাধীনে আসে। ১৭৬৫ খৃষ্টাব্দ হতে ১৮৫৬ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত চারজন গভর্ণর ও উনিশজন গভর্ণর জেনারেল ব্রিটিশ সরকারের উচ্চ পদস্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করে। তারা বাংলার শাসনকার্যে রাখে বিশেষ ভূমিকা। কিন্তু গভর্ণর জেনারেল লর্ড ক্যানিং এর শাসনকাল বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। লর্ড ডালহোসির পর ১৮৫৬ খৃষ্টাব্দে লর্ড ক্যানিং ভারতের গভর্ণর জেনারেল হয়ে আসেন। তার সময়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল - ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিওেদাহ। এটাকে অনেক ঐতিহাসিক স্বাধীনতার সংগ্রাম বলে অভিহিত করে থাকে। ভারতীয়দের মনে যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছিল এটা তার বহিঃপ্রকাশ। এ বিদ্রোহের যবনিকাপাত ঘটতে না ঘটতে কোটচাঁদপুর অঞ্চলে নীল বিদ্রোহ ব্যাপক আকার ধারণ করে। কোটচাঁদপুর উপজেলার নিকটবর্তী সাবদালপুর ইউনিয়নের দুতিয়ারকুঠি গ্রামে ব্রিসবেনের নীলকুঠি এবং বলুহর ইউনিয়নের রহমতপুর (রিপন পল্লী) গ্রামে নীল কুঠি ছিল। রহমতপুর গ্রামে নীলকুঠির ম্যানেজার ছিল গ্যাসকটম। এছাড়া কোটচাঁদপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে নীল খোলাও ছিল। ১৮৫৯ - ৬০ খৃষ্টাব্দের দিকে চৌগাছার শিশির ঘোষ নীল বিদ্রোহের সুত্রপাত ঘটায়। এর ঢেউ লাগে এ অঞ্চলের নীলচাষীদের মধ্যে। এতে নীলকররা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে এবং নীলচাষীরা বিদ্রোহের অগ্নিমন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। এ বিদ্রোহ দমনের জন্য প্রশাসনিক বিন্যাসকরণ করে। ১৮৬৩ সালে কোটচাঁদপুর সাবডিভিশন বিলুপ্ত করে ঝিনাইদহ সাব ডিভিশনের উৎপত্তি ঘটে। কেননা সে সময় ঝিনাইদহ অঞ্চলে নীল বিদ্রোহের প্রসারতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। ইংরেজরা জনগণের রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি উপলদ্ধি করে। ১৮৮৫ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস দল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ভারতীয়দের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতার ঢেউ লাগে। এরই মধ্যেই ১৮৯৯ সালে লর্ড কার্জন ভারতের ভাইসরয় নিযুক্ত হয়ে নিজ বিদ্যা বুদ্ধি ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ দিয়ে ভারতীয় শাসন ব্যবস্থা সুদৃঢ় করতে সচেষ্ট। তার সময়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা ১৯০৫ সালে বঙ্গ  ভঙ্গের মাধ্যমে সমগ্র বঙ্গদেশ দুটি প্রদেশে বিভক্ত করে। কোটচাঁদপুর পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রদেশের অন্তর্ভূক্ত হয়। বঙ্গভঙ্গ মুসলমানদের সমর্থন লাভ করে। অপরদিকে হিন্দুদের চরম বিরোধিতার মুখে ১৯১১ সালে লর্ড হার্ডিঞ্জ দিল্লীর দরবারে পঞ্চম জর্জের অভিষেক অনুষ্ঠান বঙ্গভঙ্গ বাতিল করে। বাংলার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় বাঙালিরা সুযোগ পেলে বিদ্রোহ করতে পিছুপা হয় না। ব্রিটিশ শাসনের শেষ দিকে অর্থ্যাৎ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অব্যহতি পরে ভারতীয় উপমহাদেশে শ্রমিক অসন্তোষ বিরাট আকার ধারণ করে। শ্রমিক অসন্তোষের গুরুত্ব অনুধাবন করে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল ভারতীয় উপমহাদেশে রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানের প্রেরণ করেন। এ প্রতিনিধি দলের প্রস্তাবনা অনুযায়ী কোটচাঁদপুর ‘গ’ গ্রুপের অন্তর্ভূক্ত হয়। কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের অন্তবিরোধের কারণে প্রস্তাবনাসমূহ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। এ বিরোধ মীমাংসার জন্য ব্রিটিশ সরকারের ভারতীয় উপমহাদেশের শেষ ভাইসরয় লর্ড মাউন্ট ব্যাটেন ভারত বিভাগের প্রস্তাব ভারতবাসীর সামনে উপস্থাপন করেন। এরই অংশ হিসেবে ব্রিটিশ সরকার ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ভারত স্বাধীনতা আইন পাশ করে। এ আইনের দ্বারা ভারত ও পাকিস্তান দুটি রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়। কোটচাঁদপুর পাকিস্তান অংশে পড়ে। সদ্য স্বাধীন পাকিস্তানের মধ্যে অঞ্চলভিত্তিক বৈষম্য দেখা দেয়। পাকিস্তানীরা এর প্রথম আঘাত হানে পূর্ব বাংলা জনগণের মাতৃভাষার উপর। এরই প্রেক্ষিতে ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়। ১৯৫৬ সালে সংবিধান প্রণীত হলে পূর্ব বাংলার নাম পূর্ব পাকিস্তান এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে গ্রহণ করা হয়। ১৯৫৬ সালে প্রণীত সংবিধানে পূর্ব বাংলার নাম পূর্ব পাকিস্তান গৃহীত হলে কোটচাঁদপুর পূর্ব পাকিস্তানের অংশ হয়ে পড়ে। ১৯৬২ সালে হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয়দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের পথ ধরে আসে ১৯৭০ সালের নির্বাচন। এ নির্বাচনে জাতীয় পরিষদের ৩১৩ টি আসনের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানে ১৬৯ টি আসন ও পশ্চিম পাকিস্তানে ১৪৪ টি আসন নির্ধারন করা হয়। ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর বাঙালীর অগ্নি পরীক্ষার দিন। আওয়ামী লীগ সহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল অংশ গ্রহণ করে থাকে। সকল দলের অংশ গ্রহণের মাধ্যমে জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের নির্ধারিত ১৬৯ টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ১৬৭ টি আসন লাভ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্টতা অর্জন করে। এই নির্বাচনে কোটচাঁদপুর এলাকা থেকে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন জনাব মঈন উদ্দীন মিয়াজী।

 

সংখ্যাগরিষ্ট দলের নেতা শেখ মুজিবর রহমান এর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যাপারে পাকিস্তানীরা টালবাহানা শুরু করে। এরই অংশ হিসাবে ১৫ই মার্চ’ ৭১ হতে ২৪ মার্চ’ ৭১ পর্যন্ত শেখ মুজিবর রহমানের সাথে ইয়াহিয়া ও ভূট্টোর আলোচনা চলতে থাকে। আলাপ-আলোচনার সমাপ্তি ঘোষণার পূর্বে ইয়াহিয়া ও ভূট্টো ঢাকা ত্যাগ করলে ২৫ মার্চ রাতে ঢাকা সহ দেশের সর্বত্র গণহত্যা শুরু করে। এর ঢেউ কোটচাঁদপুর লাগে। কোটচাঁদপুর মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসাবে আবির্ভূত হয়। দেশীয় রাজাকার, আল-বদর, আল-শামসরা লুটতরাজ হত্যা শুরু করে। এতে লোকজন আতঙ্কিত হয়ে পায়ে হেঁটে কিংবা গরুর গাড়ীতে করে জীবন বাঁচানোর তাগিদে প্রতিবেশি রাষ্ট্র ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করে। কিছু লোকজন এলাকায় থেকে প্রিয় মাতৃভূমি দেশমাতৃকার রক্ষায় সচেষ্ট হন। দেশ মাতৃকার রক্ষায় দেশীয় অভ্যন্তরীন পাকিস্তানী সৈন্যবাহিনীর সহায়ক শক্তি রাজাকারদের হাতে মহেশপুর উপজেলার ফতেপুর গ্রামের নিবাসী মফিজুর রহমান সাবদালপুর গ্রামে শহীদ হয়। অপরজন কোটচাঁদপুর উপজেলার বলুহর ইউনিয়নের পারলাট গ্রামের নিবাসী তমিজউদ্দীন শহীদ হন। অনেকেই পঙ্গুত্ব বরণ করেন। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাক হানাদার বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার নিয়াজী ৯৩ হাজার সৈন্যসহ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে (রেসকোর্স ময়দান) যৌথ বাহিনীর নিকট আত্মসমর্পন করলে বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে। নব্য বাংলাদেশে কোটচাঁদপুর নবতর জীবন লাভ করে।  

 

(লেখক- দেব নারায়ণ, সহকারী শিক্ষক, তালসার সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়)